ঘুরে এলাম China

ডোরেমনের টাইম মেশিনে চেপে চলুন পিছিয়ে যাই ১৫০ বছর আগে। অষ্টাদশ শতকে ওয়ারেন হেস্টিংস এর সময় এক চৈনিক ব্যবসায়ী ‘Tong Achi’ ব্রিটিশ কলকাতায় আসেন। কলকাতা থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে ইছাপুরে স্থাপন করেন বাংলার প্রথম আখের কল, তৈরি হয় ভারতের প্রথম দানা চিনি। কিন্তু না, ওনার এই ব্যবসা বেশিদিন চলেনি। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর তাঁর কর্মচারীরা চলে আসেন সবচেয়ে কাছের শহর কলকাতায়। কলকাতার ‘ টেরিটি বাজার ‘ অঞ্চলে তারা বসবাস শুরু করেন। তাঁরা চামড়া বা ট্যানারির ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু সেখানেও বাধ সাধলো ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা, তারা তো কিছুতেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে ট্যানারির ব্যবসা চালাতে দেবেন না। অতএব সরিয়ে দেওয়া হলো কলকাতার বাইরে ট্যাংরা নামক জায়গায়। কালে কালে গড়ে উঠলো কলকাতার দ্বিতীয় চায়না টাউন। হাক্কা সম্প্রদায়ের মানুষের আগমনে কলকাতা তথা ভারতে শুরু হলো নতুন খাবারের যুগ – চীনা খাবার।

আমরা আমাদের চীনা খাবারের অভিযান শুরু করলাম নতুন চায়না টাউন থেকে। প্রথম দিনেই কপাল খারাপ, আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেছিল। দুপুর গড়িয়ে সময় তখন বিকেল চারটে। Ah Leung থেকে শুরু করে Namking যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই বন্ধ। চায়না টাউনের শেষভাগে Beijing বা Golden Joy খোলা থাকলেও সেখানের পকেট খালি করা দামে পা ফেলতে মন চাইলো না। আমার আর জয়দীপ দার দুজনেরই ইচ্ছে ছিলো Kimli গিয়ে পর্ক খাবো, সেটাও বন্ধ। কিন্তু ওই যে চায়না টাউন এসেছি কিন্তু চাইনিজ খাবার না খেয়ে বাড়ি চলে যাবো! এ তো হয় না যেকোনো জায়গা হলেই হবে। গুগল ম্যাপ দেখে পথ খুঁজে যেতে যেতে হঠাৎ চোখে পড়ল ‘Kimling Restaurant‘। জিজ্ঞেস করে জানলাম খোলা আছে অতঃপর একপেট খিদে নিয়ে অয়ন, জয়দীপ দা, শ্রেয়া আর আমি ঢুকে পড়লাম ভেতরে।

ভেতরে বসার জায়গাটা বেশ বড়, আমরা ঢুকিয়ে দেখলাম রীতিমত ভালোই ভিড়। একটা টেবিল দখল করে হাতে মেনুকার্ড নিয়ে চোখ বোলাতেই প্রথম হতাশা – ‘ পর্ক পাওয়া যায় না ‘ । অগত্যা চিকেন বাবাজিই ভরসা। আশেপাশের টেবিলে চোখ বুলিয়ে বুঝলাম পরিমাণটা বেশ ভালোই দেয়। অর্ডার করলাম – মিক্সড হাক্কা চাওমিন, মিক্সড ফ্রাইড রাইস ও চিল্লি গার্লিক চিকেন। প্রত্যেকটিই এক প্লেট করে নিয়েছিলাম, পরে অবশ্য আরো এক প্লেট হাক্কা চাওমিন নিলাম। চিলি গার্লিক চিকেন টায় টক ঝাল এর একটা সুন্দর মিলমিশ ছিলো। এক প্লেটে আবার দিয়েছেও ১৬ পিস। ভাবা যায় বলুন তো?

খাওয়ার মাঝে হঠাৎই চোখে পড়ল ভিনিগার এর সঙ্গে একটি সবুজ রঙের থকথকে পেস্ট টেবিলে রাখা। কি হবে না হবে ভেবে নিচ্ছিলাম না, কিন্তু অয়ন বাবাজির আবার সব জিনিস চেখে না দেখলে হয় না। অল্প একটু মুখে দিয়েই চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো এ এক দারুন জিনিস। সঙ্গে সঙ্গে নিয়েই খেয়ে বুঝলাম কাঁচা-লঙ্কার সাথে আরো কিছু মশলা মেশানো পেস্ট। একটা সুন্দর টক-ঝাল এর ব্যাপার আছে।

চাওমিন এবং ফ্রাইড রাইস এ ভর্তি ভর্তি করে ডিম চিকেন এবং চিংড়ির ছড়াছড়ি। দুটোরই স্বাদ দারুন, এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায়। দ্বিতীয়বার যে চাওমিন টা অর্ডার করেছিলাম সেটা তো একটু হতাশই হলাম আগের তুলনায় চিংড়ির সংখ্যা নিতান্তই অনেক কম।

খাওয়া-দাওয়া মিটিয়ে বাইরে বেরোলাম ঘড়ির কাঁটা তখন সন্ধ্যে ৫.৩০-৪০ হবে। তখন চোখে পড়ল বাইরের দিকটা আরো একটি বসার জায়গা আছে, তবে সেটি শুধু মাত্র ছেলেদেরই জন্য। চায়না টাউন থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ির পথে রওনা দিলাম

দ্বিতীয় দিন

তপসিয়ার Episode One এ বসে হুকা সহযোগে স্টার্টার খেতে খেতে প্ল্যান হলো Kimli যাওয়ার। ৭ টা বেজে গেছিলো বলে শ্রেয়া আর গেল না। আমি আর জয়দীপ দা ঠান্ডার মধ্যে পর্ক খাবার বাসনা নিয়ে হাঁটা লাগালাম Kimli এর দিকে। দরজা দিয়ে ঢুকতেই মন খুশ, দরজায় লেখা ‘ We Serve Pork

ভেতরের জায়গাটি বেশ ছোটই। ঢুকে দেখি আরও চার পরিচিত দাদা দিদি বসে আছে। ওদের তখন স্টার্টার সেরে মেন কোর্স শুরু হয়েছে। আমরা বসেই অর্ডার করলাম ১ প্লেট পর্ক ওয়ান্টন। ১০০ টাকায় ২০ পিস দেবে শুনেই আমরা খুশি আর অবাক দুরকম দৃষ্টি নিয়েই দুজনের দিকে চেয়ে রইলাম। ৫-১০ মিনিট অপেক্ষার পর পকচই সহযোগে হাজির হলো ওয়ান্টন। অপূর্ব খেতে যাকে বলে। এটির টানে বারবার কিমলি তে আশাই যায়।

এরপর নিলাম চিল্লি রোস্ট পর্ক। ওয়ান্টন টা যত মন কেড়েছিলো এটা মুখে দিয়েই মনটা ততোই খারাপ হয়ে গেলো। একেবারেই ছিবড়ে ও পরিমাণও খুবই কম। পাশের টেবিল থেকে চাওমিন ট্রাই করলাম সেটাও খুব একটা ভালো না। একদম সেদ্ধ করেই দিয়ে দিয়েছে যেন, নুন ঝাল কিচ্ছু নেই।

Chilli Roast Pork

দুদিনে নতুন চায়না টাউনের দুটো জায়গায় স্বাদ গ্রহণ করে ইচ্ছে জাগলো একবার আদি চায়না টাউন ঘুরে আসার। আমার মত ল্যাদ প্রিয় মানুষের পক্ষে এই শীতের ভোরে চাইনিজ ব্রেকফাস্ট করতে আসা সম্ভব না। তারচেয়ে বরং চেষ্টা করবো একদিন Tung Nam Eating House এ ঘুরে আসার।

আজ এ পর্যন্তই। দেখা হচ্ছে পরের ব্লগে। 😃

Follow my food journey on @Zomato! —https://zoma.to/u/38810479

Follow me on Instagram – https://instagram.com/kolkata_foodie_tales

Follow me on Facebook – https://www.facebook.com/kolkatafoodietales/